আগামী নির্বাচনের ফলাফলে কেন ‘প্রভাবক’ হয়ে উঠতে পারেন সুইং ভোটাররা

Share আগামী নির্বাচনের ফলাফলে কেন ‘প্রভাবক’ হয়ে উঠতে পারেন সুইং ভোটাররা

বাংলাদেশের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা জোরেশোরে প্রচার–প্রচারণা শুরু করেছে। দেশের সর্বশেষ তিনটি জাতীয় নির্বাচন তুলনামূলকভাবে একতরফা হওয়ায় এবারের নির্বাচন এবং এর ফলাফল নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে আগ্রহ ও কৌতূহল।

নির্বাচনের মাঠের বাস্তব চিত্র বুঝতে বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা ও রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পরিচালিত হচ্ছে নানা ধরনের জরিপ। এসব জরিপের কয়েকটিতে দেখা গেছে, ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো ঠিক করে উঠতে পারেননি—আগামী নির্বাচনে তারা কাকে ভোট দেবেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের নির্বাচনে জয়–পরাজয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তথাকথিত সুইং ভোটাররা। অর্থাৎ, যারা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রতি স্থায়ী আনুগত্য না রেখে নির্বাচনকালে সব দিক বিবেচনা করে ভোটের সিদ্ধান্ত নেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেন,
“সুইং ভোটারদের কোনো একটি দলের প্রতি শক্তিশালী ও স্থায়ী সমর্থন থাকে না। কিন্তু এই ভোটাররাই অনেক সময় নির্বাচনের ফলাফলকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে।”

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৬ লাখ। এর মধ্যে চার কোটিরও বেশি তরুণ ভোটার, যারা এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনো দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছে। ফলে তাদেরকেও আগামী জাতীয় নির্বাচনে সম্ভাব্য সুইং ভোটার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। এ কারণে দলটির নিয়মিত ভোটারদের একটি বড় অংশও এবার সিদ্ধান্তহীনতায় পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদেরকেও সম্ভাব্য সুইং ভোটার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সুইং ভোটার কী? কেন ‘সুইং’ বলা হয়?

বাংলাদেশে ‘সুইং ভোটার’ ধারণাটি খুব বেশি পরিচিত না হলেও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে এটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রচলিত। উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে দলভিত্তিক স্থায়ী ভোটব্যাংক শক্তিশালী থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ভোটার এক দল থেকে অন্য দলে ভোট দেওয়ার প্রবণতা দেখাতে শুরু করেন। এই দোদুল্যমান ভোটারদেরই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘সুইং ভোটার’ বলা হয়।

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন,
“সুইং ভোটাররা একবার এদিকে যায়, আবার অন্যদিকে যায়। দোলনার মতো দোদুল্যমান অবস্থানের কারণেই তাদের সুইং ভোটার বলা হয়।”

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে সুইং ভোটারদের পাশাপাশি ‘সুইং স্টেট’ বা দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যের ধারণাও রয়েছে। এসব রাজ্যের ভোট অনেক সময় পুরো নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন বিবিসি বাংলাকে বলেন,
“বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনেক ভোটারই আগে থেকে নিশ্চিত থাকে না সে কাকে ভোট দেবে। এই কারণেই সুইং ভোটারের ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

তার মতে, সুইং ভোটাররা ভোটের আগমুহূর্ত পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেন।
“ভোট দেওয়ার আগে তারা ভাবেন—কাকে ভোট দিলে তার লাভ হবে, কাকে ভোট দিলে সে নিরাপদ বোধ করবে। এটি সুইং ভোটারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।”

রাজনৈতিক বিজ্ঞানে সুইং ভোটারদের নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে। একসময় ধারণা করা হতো, এরা রাজনৈতিকভাবে কম সচেতন। তবে পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, এই ভোটাররা বরং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেন।

বাংলাদেশের সুইং ভোটার কারা?

বাংলাদেশের সর্বশেষ অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালে। সেনা–সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।

সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছিল ৪৮ শতাংশ ভোট, আর বিএনপি–জামায়াত জোট পেয়েছিল ৩৩ শতাংশ। অথচ এর আগের ২০০১ সালের নির্বাচনে দুই জোটের ভোটের হার ছিল প্রায় সমান।

২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট পেয়েছিল ৪০ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভোট, আর আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪০ দশমিক ১৩ শতাংশ। যদিও ভোটের ব্যবধান খুব বেশি ছিল না, তবুও আসন সংখ্যার পার্থক্য ছিল ব্যাপক।

এর আগে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের হার সাধারণত ৩০ থেকে ৩৭ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির ভোটের হার ছিল গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ, যা এককভাবে সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

অধ্যাপক কে এম মহিউদ্দিন মনে করেন, বাংলাদেশের বড় দুই দলের সমর্থন বিভিন্ন সময় কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। ইস্যুভিত্তিক কারণে সুইং ভোটাররা একেক নির্বাচনে একেক দলকে সমর্থন দেওয়ায় কখনো আওয়ামী লীগ, কখনো বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে।

বর্তমানে দেশের প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের বড় একটি অংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, এই সিদ্ধান্তহীন ভোটারের হার ৪৩ থেকে ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় তাদের ঐতিহ্যগত ভোটারদের বড় একটি অংশও এবার বিকল্প খুঁজছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন,
“আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় দলটির যেসব ভোটার ছিলেন, তাদের বড় অংশকেই আমরা এবার সুইং ভোটার হিসেবে দেখছি।”

© 2016-2026 | 24 online newspaper All rights reserved.
24 online newspaper logo