এস আলমের আন্তর্জাতিক সালিস মামলায় সরকারের বড় প্রস্তুতি—ঘণ্টায় ১,২৫০ ডলারে ব্রিটিশ ল ফার্ম নিয়োগ
Share
আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা সাইফুল আলম ও তার পরিবারের দায়ের করা মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে নামছে বাংলাদেশ সরকার। এ উদ্দেশ্যে একটি শীর্ষস্থানীয় ব্রিটিশ আইন প্রতিষ্ঠান নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যেখানে ঘণ্টাপ্রতি ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ২৫০ মার্কিন ডলার।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই ল ফার্ম নিয়োগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়।
🔴 সরকারের বিরুদ্ধে করা আন্তর্জাতিক সালিসি মামলা পরিচালনায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে কমিটি।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি দায়ের করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের অধীনস্থ ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (আইসিএসআইডি)–এ। মামলার নম্বর ARB/25/52। প্রস্তাব পর্যালোচনা শেষে সরকারের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনার জন্য ব্রিটিশ ল ফার্ম ‘হোয়াইট অ্যান্ড কেইস এলএলপি’–কে নিয়োগের অনুমোদন দেওয়া হয়।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির আইনি সেবা গ্রহণে ঘণ্টায় ১,২৫০ মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হবে। তবে বিলযোগ্য সময় কীভাবে গণনা করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
বৈঠক শেষে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন,
🗣️ “অর্থ পাচারের অভিযোগকে কেন্দ্র করে এস আলম লন্ডনে মামলা করেছে এবং সেটি আইসিএসআইডিতে চ্যালেঞ্জ করেছে। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং বড় অঙ্কের অর্থের সঙ্গে জড়িত।”
তিনি আরও জানান, এই মামলার বিষয়ে আইসিএসআইডি থেকে বাংলাদেশ সরকারকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকারের জবাব দাখিল করতে হবে।
প্রসঙ্গত, গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে অবস্থিত আইসিএসআইডিতে এস আলম ও তার পরিবারের আইনজীবীরা আনুষ্ঠানিকভাবে সালিসি আবেদন করেন। আবেদনে অভিযোগ করা হয়, অবৈধ অর্থ পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশ সরকার যে ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, তাতে তাদের শত শত কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
সালিসি আবেদনে আরও দাবি করা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে তাদের লক্ষ্য করে
-
ব্যাংক হিসাব জব্দ
-
সম্পদ বাজেয়াপ্ত
-
ব্যবসায়িক কার্যক্রমে তদন্ত
-
এবং গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে
যা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তির পরিপন্থী।
এস আলম পরিবার ২০০৪ সালের বাংলাদেশ–সিঙ্গাপুর দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ চুক্তির আওতায় এই মামলা করেছে। নথি অনুযায়ী, তারা ২০২০ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করে এবং ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে। বর্তমানে তারা সিঙ্গাপুরে বসবাস করছে।
সালিসি আবেদনে তারা সিঙ্গাপুরের নাগরিক হিসেবে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের বিদেশি ব্যক্তিগত বিনিয়োগ আইনের অধীনেও সুরক্ষা দাবি করেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগে একাধিক শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনৈতিক শ্বেতপত্রে মোট অর্থ পাচারের পরিমাণ আনুমানিক ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। এ বিষয়ে গঠিত টাস্কফোর্সের প্রধান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর জানিয়েছেন, এস আলম পরিবার একাই প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্তর্জাতিক সালিসি মামলা শুধু আইনি নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও নীতিগত অবস্থানের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চ্যালেঞ্জ।
