আশিক মাহমুদের নেতৃত্বে বিনিয়োগ পরিস্থিতি: বিডার উদ্যোগে কতটা বাড়ল বিদেশি বিনিয়োগ?
Share
২০২৪ সালের ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিস শহরের আকাশে প্রায় ৪১ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে বাংলাদেশের পতাকা হাতে স্কাইডাইভ করে আলোচনায় আসেন চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তাঁর সেই দুঃসাহসিক লাফ বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ২০২৪ সালের ১ জুলাই তা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডের স্বীকৃতি পায়। কয়েক মাসের মধ্যেই, ১২ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান।
নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর আত্মবিশ্বাসী এই কর্মকর্তা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে নানা প্রচারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের নানা উদ্যোগ—এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে চেষ্টা করেন।
তবে দেড় বছরের অভিজ্ঞতার পর এখন প্রশ্ন উঠছে, এসব উদ্যোগের বাস্তব ফলাফল কতটা দৃশ্যমান হয়েছে। সরকারি ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এসেছে প্রায় ৫৫ কোটি ডলার, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় কম। যদিও মোট নিট এফডিআই প্রবাহ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬৯ কোটি ডলার, অর্থনীতিবিদদের মতে এর একটি বড় অংশ এসেছে আগে থেকে কার্যরত কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগ ও ঋণের মাধ্যমে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্ট (বিওপি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল প্রায় ৮৬ কোটি ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে তা ছিল প্রায় ১১৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহ প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে।
একই সঙ্গে শিল্পখাতে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিও কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির অর্থ পরিশোধ কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশ। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শিল্পায়ন ও নতুন বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ প্রবণতাও কিছুটা নিম্নমুখী। সরকারি তথ্য বলছে, জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ২২.৪৮ শতাংশে, যা আগের বছর ছিল ২৩.৫১ শতাংশ। পাশাপাশি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য কেবল প্রচারণা বা সম্মেলন আয়োজনই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্থিতিশীল নীতি, উন্নত অবকাঠামো, সহজ ব্যবসায়িক পরিবেশ এবং শক্তিশালী আর্থিক খাত। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা—এসব বিষয় বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখে।
বিডার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অতীতে অনেক অকার্যকর বা বাস্তবায়নহীন বিনিয়োগ নিবন্ধন হতো, সেগুলো কমে যাওয়ায় নিবন্ধিত প্রকল্পের সংখ্যা কমেছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভবিষ্যতে টেকসই বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য নীতিগত সংস্কার ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে হলে সরকার, নীতিনির্ধারক ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বাড়ানো—এসবই হবে প্রকৃত সাফল্যের সূচক।
