মোস্তাফিজ থেকে বিশ্বকাপ বয়কট: ক্রিকেটে নেই ক্রিকেট, দখল নিয়েছে রাজনীতি ও হাজার কোটি টাকার হিসাব!
Share
খবরটা এসেছিল গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর। আইপিএলের নিলামে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে ভেড়ায় কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে এত দামে এর আগে কোনো বাংলাদেশি ক্রিকেটার বিক্রি হননি। স্বাভাবিকভাবেই খবরটি দেশজুড়ে আনন্দের ঢেউ তোলে। ক্রিকেটপ্রেমীরা ভেবেছিলেন—বাংলাদেশি ক্রিকেটের আরেকটি মাইলফলক রচিত হলো।
কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস বেশিদিন টেকেনি। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ ও উগ্রপন্থীদের বিরোধিতার মুখে ৩ জানুয়ারি মোস্তাফিজকে ছেড়ে দিতে কেকেআরকে নির্দেশ দেয় বিসিসিআই। সেখান থেকেই শুরু হয় একের পর এক জটিলতা। ধীরে ধীরে বিষয়টি গড়িয়ে যায় ক্রিকেটের গণ্ডি পেরিয়ে রাজনীতি ও অর্থনীতির মঞ্চে—যেখানে ক্রিকেট যেন কেবল নামেমাত্র।
দিন যত গড়িয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে—মাঠের খেলাটাই এখন সবচেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। মাঠের বাইরে সিদ্ধান্ত, পাল্টা সিদ্ধান্ত, বিরোধিতা আর অর্থনৈতিক হিসাবই নিয়ন্ত্রণ করছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গতিপথ। আর এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ দর্শকরা—যারা ক্রিকেট দেখতে চান, রাজনীতি নয়।
মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার পর নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জানিয়ে বাংলাদেশ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতে ম্যাচ খেলতে আপত্তি জানায়। এই অবস্থানে অনড় থাকায় শেষ পর্যন্ত আইসিসি বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ থেকেই বাদ দেয়। এর রেশ কাটতে না কাটতেই পাকিস্তান ঘোষণা দেয়—ভারতের বিপক্ষে তারা টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলবে না।
ফলাফল?
বাংলাদেশি দর্শকেরা বিশ্বকাপে নিজেদের দলকে দেখতে পাবেন না। ভারত ও পাকিস্তানের সমর্থকেরা বঞ্চিত হবেন সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ম্যাচটি থেকে। অথচ এই ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরেই আইসিসির সবচেয়ে বড় আয়ের অংশ নির্ভর করে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির দাবি অনুযায়ী, একটি ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ছয় হাজার কোটি টাকারও বেশি। পাকিস্তান ম্যাচ না খেললে এই বিশাল অঙ্কের আয় হারাবে আইসিসি—যার প্রভাব পড়বে সদস্য দেশগুলোর লভ্যাংশেও।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহকে অনেকেই তুলনা করছেন ‘ডমিনো ইফেক্ট’-এর সঙ্গে। একটি দেশের ঘরোয়া লিগে একজন খেলোয়াড়কে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত ধাপে ধাপে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে তিনটি দেশ ও একটি বিশ্বকাপ জড়িয়ে পড়েছে বিরোধে।
আইসিসির সাবেক হেড অব কমিউনিকেশন সামি-উল-হাসান মনে করেন, পরিস্থিতি এত দূর যাওয়ার প্রয়োজন ছিল না। তাঁর মতে, বিসিসিআই চাইলে বিষয়টি আরও সংবেদনশীলভাবে সামলাতে পারত। প্রকাশ্য ঘোষণা না দিয়ে নীরব সমাধানের পথ নিলে এত বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি হতো না।
বাস্তবতা হলো—উপমহাদেশের ক্রিকেটে এখন ব্যাট-বলের আড়ালে চলছে রাজনীতি ও অর্থের লড়াই। আইসিসির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ এবং পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভির রাজনৈতিক পরিচয়ই সেটার বড় উদাহরণ।
বিশ্বকাপ শুরু হতে এখনো কয়েক দিন বাকি। সমাধানের আশা একেবারে শেষ হয়ে যায়নি। তবে এটুকু পরিষ্কার—এই সংকট আর ক্রিকেটীয় যুক্তিতে মেটার নয়। কারণ ক্রিকেট এখন আর শুধু খেলা নেই; এটি রাজনীতি, প্রভাব ও অর্থনীতির এক জটিল খেলায় পরিণত হয়েছে।
