মুসলিম সিসিলি: ইতিহাস, শাসন ও স্থাপত্য

Share মুসলিম সিসিলি: ইতিহাস, শাসন ও স্থাপত্য

ইউরোপে ইসলামের পদচিহ্ন বলতে আমরা প্রায়শই আন্দালুস বা অটোমান সাম্রাজ্যের কথা ভাবি। কিন্তু ভূমধ্যসাগরের তীরে ইতালির দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত সিসিলি দ্বীপের মুসলিম ইতিহাস প্রায়শই অননোচিত থেকে যায়। দীর্ঘ ২০০ বছরের বেশি সময় মুসলিম শাসনের অধীনে থাকা এই দ্বীপ শুধু সামরিক বিজয়ই নয়, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থলও হয়েছিল।

সিসিলি বিজয়ের সূচনা
সিসিলি মুসলিম বিজয়ের সূচনা হয় উত্তর আফ্রিকার আঘলাবি রাজবংশের হাত ধরে। আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদের সময় ইব্রাহিম ইবনে আল-আঘলাব তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ানে এই বংশের পত্তন করেন। ৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে বাইজেন্টাইন নৌ কমান্ডার ইউফেমিয়াস বিদ্রোহ করলে আঘলাবি আমির জিয়াদাতুল্লাহ তাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেন। ৮২৭ খ্রিষ্টাব্দে সেনাপতি আসাদ ইবনে আল-ফুরাতের নেতৃত্বে ১০ হাজার সৈন্য সিসিলিতে প্রবেশ করে। ৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে পালেরমো (তৎকালীন বালার্ম) বিজিত হয় এবং মুসলিম সিসিলির রাজধানী হয়।

শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামো
মুসলিম শাসনামলে সিসিলি সমৃদ্ধ প্রদেশে পরিণত হয়। মুসলিমদের জন্য ইসলামি আইন কার্যকর থাকলেও খ্রিষ্টান ও ইহুদিদের নিজেদের ধর্মীয় আইন অনুযায়ী বিচার কার্যকর ছিল। অমুসলিমরা ‘জিজিয়া’ কর দিয়ে পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করত। তিনটি প্রধান গোষ্ঠী ছিলেন—আরব অভিজাত, আমাজিঘ (বার্বার) যোদ্ধা এবং স্থানীয় নব্য মুসলিম।

ফাতিমি শাসন ও অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা
দশম শতাব্দীর শুরুতে সিসিলি ফাতিমি শাসনের অধীনে আসে। ফাতিমিদের কঠোর করনীতি ও ধর্মীয় বৈপরীত্যের কারণে সুন্নি সংখ্যাগুরু সিসিলিয়ানরা বারবার বিদ্রোহ করে। ৯৪৮ সালে আল-হাসান আল-কালবি গভর্নর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন এবং প্রায় ১০০ বছর সিসিলি শাসন করেন।

মুসলিম সিসিলির পতন
একাদশ শতকের শুরুতে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ছোট রাজ্যে বিভক্ত হওয়ায় নরম্যানরা আক্রমণ শুরু করে। ১০৭২ সালে পালেরমো এবং ১০৯১ সালে নোতো নরম্যানদের দখলে চলে যায়। এর মাধ্যমে মুসলিম সিসিলির ২০০ বছরের সরাসরি শাসন শেষ হয়।

স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার
আজও সিসিলির স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে মুসলিম প্রভাব চোখে পড়ে। পালেরমোর ক্যাথেড্রালে অ্যারাবিক ক্যালিগ্রাফি, সান জিওভান্নি দেগলি এরেমিটি গির্জার লাল গম্বুজ আরব স্থাপত্যের সাক্ষ্য দেয়। সিসিলি রান্নায় লেবু, কমলা, আখ, পেস্তা ও জাফরান মুসলিমদের প্রচলিত।

© 2016-2026 | 24 online newspaper All rights reserved.
24 online newspaper logo