নবী মুসা ও হারুন থেকে শেখা টিমওয়ার্কের চিরন্তন শিক্ষা

Share নবী মুসা ও হারুন থেকে শেখা টিমওয়ার্কের চিরন্তন শিক্ষা

একবিংশ শতাব্দীতে যখন আমরা করপোরেট জগৎ বা সামাজিক সংগঠনের সফলতার মূলমন্ত্র খুঁজি, তখন ‘টিমওয়ার্ক’ বা দলগত প্রচেষ্টার কথা অবধারিতভাবে সামনে আসে। কিন্তু কয়েক হাজার বছর আগে পবিত্র কোরআন এবং নবীদের জীবনের পাতায় এই দলগত কর্মনীতির নিখুঁত ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা পাওয়া যায়। বিশেষ করে নবী মুসা ও হারুন (আ.)-এর সমন্বয় ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সহযোগিতা আধুনিক বিশ্বের যেকোনো দলগত কাজের জন্য এক চিরন্তন আদর্শ।

নেতৃত্বের বিনয় ও সীমাবদ্ধতা স্বীকার

মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে নবুয়ত লাভের পর ফেরাউনের দরবারে পাঠানো হলে একাই সব করার দাবি করেননি। তিনি জানতেন, তাঁর কাজ অত্যন্ত গুরুদায়িত্বপূর্ণ, তাই একজন দক্ষ সহযোগীর প্রয়োজন। নিজের বাকপটুতা ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা তিনি আল্লাহর কাছে অকপটে স্বীকার করেছিলেন।

পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:

‘আমার ভাই হারুন, সে আমার চেয়ে অনেক বেশি বাক্পটু; তাই তাকে আমার সঙ্গে সাহায্যকারী হিসেবে পাঠান, যেন সে আমাকে সমর্থন করে।’ (সুরা কাসাস, আয়াত: ৩৪)

একজন মহান নবীও নিজের ছোট ভাইয়ের গুণকে বড় করে দেখেছেন এবং নিজের ঘাটতি স্বীকার করেছেন। আধুনিক নেতৃত্বের সংজ্ঞায় একে বলা হয় ‘স্বীকৃতি ও ক্ষমতায়ন’।

যোগ্যতার মূল্যায়ন ও অংশীদারত্ব

মুসা (আ.) চেয়েছিলেন, হারুন কেবল তাঁর অনুসারী না হয়ে, বরং ‘অংশীদার’ হিসেবে কাজ করুক। তিনি প্রার্থনা করেছিলেন:

‘আর আমার পরিবার থেকে আমার এক ভাইকে আমার উজির (সহকারী) বানিয়ে দিন—হারুনকে; তার মাধ্যমে আমার শক্তি বৃদ্ধি করুন এবং তাকে আমার কাজে অংশীদার করুন।’ (সুরা ত্বহা, আয়াত: ২৯-৩২)

ইসলাম আমাদের শেখায়, যখন ধর্ম বা মানবতার কল্যাণে কাজ করি, তখন অন্যের মেধা ও যোগ্যতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। একা কাজের চেয়ে যোগ্য মানুষকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করা অনেক বেশি ফলপ্রসূ।

অহংকার বনাম সহযোগিতা

অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়। নবী মুসা তাঁর ভাই হারুনকে তুচ্ছ মনে করেননি; বরং তাঁকে নিজের শক্তির উৎস হিসেবে দেখেছেন। একটি শক্তিশালী টিমে সবাই সব বিষয়ে দক্ষ হয় না—কেউ পরিকল্পনায়, কেউ বক্তৃতায়, আবার কেউ মাঠপর্যায়ে পারদর্শী। একে অপরের ঘাটতি পূরণ করাই আসল টিমওয়ার্ক।

মুহাম্মদ আল-গাজালি উল্লেখ করেছেন, ইসলামি ভ্রাতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক পরিপূরকতা, যেখানে একে অপরের ভুলগুলো শুধরে দেয় এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করা হয়। (খুলুকুল মুসলিম, ১/১৬২, দামেস্ক, ১৯৯৪)

‘টিম ইসলাম’-এর শিক্ষা

বর্তমান সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনগুলোতে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও হীনম্মন্যতা বড় সমস্যা। কেউ ভালো কাজ করলে অন্যরা প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। নবী মুসা ও হারুনের আদর্শ আমাদের শেখায়, আমরা সবাই একই দলের সদস্য; ব্যক্তিগত ইগো বা অহংকার এখানে কোনো স্থান পায় না।

আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন:

‘এক মুমিন অন্য মুমিনের জন্য একটি ভবনের মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮১)

যদি কোনো ভবনের ইটই প্রতিযোগিতা শুরু করে, ভবন ধসে পড়বে। তেমনি, আমরা যদি একে অপরের মেধা ও প্রতিভাকে স্বাগত না জানাই, জাতীয় ও ধর্মীয় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হবে না।

আধুনিক প্রেক্ষাপটে শিক্ষা

নবী মুসা ও হারুনের সমন্বয় আমাদের শেখায়:

  • স্বচ্ছতা: নিজের সামর্থ্য ও দুর্বলতা জানুন।

  • যোগ্য নিয়োগ: সঠিক মানুষকে সঠিক দায়িত্ব দিন।

  • মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তা: টিমের সদস্যদের প্রতিভা প্রকাশে উৎসাহ দিন।

  • লক্ষ্য স্থির করা: ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিন।

ফেরাউনের দরবারে মুসা একা যাননি; হারুন তাঁর পাশে সাহস ও সমর্থন দিয়েছেন। এই ‘সাপোর্ট সিস্টেম’ই যেকোনো বড় বিজয়ের মূল চাবিকাঠি। ইসলামে জামায়াত বা সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার নির্দেশ স্পষ্ট—আমরা কেউ একা পূর্ণাঙ্গ নই; কিন্তু একসাথে আমরা অপরাজেয়।

© 2016-2026 | 24 online newspaper All rights reserved.
24 online newspaper logo